Monday, September 10, 2018

গল্পঃ বন্ধু....







-ভাইয়া, আমি তোমার বন্ধুর কাছে আর পড়তে যাবনা।
-কেনো? কি হয়েছে?
-জনি ভাই তোমার বন্ধু। আমি তাকেও ভাই মনে করতাম। আর আজ উনি আমাকে প্রপোজ করছে। এখন আবার জনি ভাইয়ের কাছে পড়তে গেলে খারাপ লাগবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে যাসনে। প্রতিভা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দেব।
.
মনটা খারাপ হল। খুব খারাপ। জনির কাছ থেকে আমি এটা আশা করতে পারিনি। সে ছিল আমার ছোট বেলার বন্ধু। প্রাইমারী স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে জনির রোল নং ছিল এক আর আমার তিন। তৃতীয় শ্রেণীতে আমার এক আর জনির রোল হয় দুই। তৃতীয় শ্রেণীতে উঠার পর প্রথম যেদিন গেলাম সেদিন জনি আমাকে একটি সাদা গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল। সেইতো বন্ধুত্বের শুরু।
স্কুলের থেকে ফেরার পথে সে আমাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যেত। তার ভাই বোন কেউ ছিলনা। খুব ছোটবেলা বাবা মারা যাবার পর তার মা টেক্সটাইল মিলে কাজ করে সংসার চালাইত। আমার চোখে পানি এসে যেত। একজন মা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কত কষ্ট করে দুই জনের সংসারটাকে চালিয়ে নিচ্ছে। প্রাইমারীতে জনি বৃত্তি পেল, আমি পাইনি। সে ভর্তি হল নরসিংদী কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে আর আমি ইউ এম সি আদর্শ বিদ্যালয়ে। দুই জনের দুই স্কুল থাকায় যোগাযোগটা একটু কমে গিয়েছিল।
.
আমি যখন লেখাপড়া ছেড়ে দেই তখন জনি অনার্সে। আমি লেখাপড়া ছেড়ে ভবঘুরের মত পথে প্রান্তরে বন্ধুদের নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতাম। বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে আড্ডা দিতাম। কারণ কেউ যদি দেখে ফেলে শ্রাবণ সিগারেট খায় তাহলে চক্ষুলজ্জায় পড়তে হবে। তখনো জনির সাথে দেখা হত। আমি তার বাড়ি যেতাম। আন্টির সাথে দেখা করতাম। জনিকে এক সময় পেলে অন্যসময় পেতামনা। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করত। আমার ভালো লাগত। কারণ তার মায়ের পরিশ্রমে একটু হলেও সহায়তা হয়।
.
ছোট বোনের কাছে জানতে পারলাম আমাদের এলাকার দশ বারোজন ছেলে মেয়ে জনির কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়। সেই সুবাধে ছোট বোনটিও সবার সাথে পড়তে যেতে চায়। আব্বু আম্মুও অমত করেনি। আর আজ কিনা জনি.....
এই বিষয়ে যত ভাবব তত খারাপ লাগবে। যতটা সম্ভব অন্যদিকে মন দেয়ার চেষ্টা করি।
.
রাস্তার গলিতে দেয়ালের উপর বসে চার বন্ধু সিগারেট খাচ্ছিলাম। পড়ন্ত বিকেলেও রাস্তাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা থাকে। খেলা নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমাদের ফুটবল খেলার দলটি সেমি ফাইনালে গিয়ে হেরে গেল। খেলায় কার কি ভুল ছিল এটা ওটা বলতেছিলাম। আমার ডান হাতের দুই আঙ্গুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। আমি ঠোটে নিয়ে যেই আরেকটা টান দিচ্ছিলাম তখনই চোখে পড়ল সামনে দিয়ে জনি যাচ্ছে। জনিকে দেখে আমি দ্রুত সিগারেট লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। জনি কোন কথা না বলে চলে গেল। মনটা কিঞ্চিত খারাপ হল।
সাথের একজন বলতেছে, "জনিকে দেখে সিগারেট লুকানোর কি হল? সে তো তোর ছোট বেলার বন্ধু।"
আমি জবাব দিলাম, "সে এখনো লেখাপড়া করে। ভালো ছাত্র। আমাকে সিগারেট খেতে দেখলে ভাববে আমি খারাপ হয়ে গেছি।"
-সিগারেট খেলেই যে মানুষ খারাপ হয়ে যায় এটা কে বলল তোকে? তোর শিক্ষিত বন্ধুতো সেটা আরো ভালো করে বুঝার কথা।
-সিগারেট খেলে খারাপ হয়ে যায় না। তবে খাওয়া যে ভালো সেটাওতো না। যারা সিগারেট না খায় তারা সিগারেট এবং যারা সিগারেট খায় তাদের ভালো চোখে দেখেনা।
-সিগারেট দিয়ে পুরো জীবনের ব্যক্তিত্ব নির্বাচন করা যায়না শ্রাবণ। অনেক বড় জ্ঞাণী, গুণী, লেখক, সেবক অন্যান্য মহৎ পেশার মানুষরাও সিগারেট খায়। তাই বলে তাদের কেউ ভালো চোখে দেখবেনা সেটা আমি মানতে পারিনা।
তাদের সাথে আর তর্ক না করে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটা দিলাম। মনে মনে ভাবতেছি, জনি আমাকে খারাপ ভাবেনিতো?
.
চরাঞ্চলের একটি হাইস্কুলে জনির চাকরি হয়েছে। সে এখন একটি স্কুলের শিক্ষক। আমার গর্ব হচ্ছে। আমার বন্ধু হাই স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু জনি আমাকে একটিবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলনা কেন বুঝতে পারছিনা। মন খারাপ করলামনা। নিজেই দেখা করার জন্য মনস্থির করলাম। কিন্তু একটা উপহার নিয়ে যাওয়া দরকার। কি নেয়া যায় সেটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে হল একটি কলম উপহার দেই। জনি যখন স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াবে তখন তার পকেটে থাকবে কলম। নয়তো হাতে কলম নিয়ে হাজিরা খাতায় রোল নং ডাকবে। ১, ২, ৩, ৪....
ভাবলেই কেমন ভালোলাগা কাজ করে।
.
একটা সাদা গোলাপ নিলাম সাথে। প্রাইমারী স্কুলে আমি প্রথম হওয়ায় জনি একটি সাদা গোলাপ দিয়েছিল। আজ আমিও তাকে সাদা গোলাপ উপহার দেব।
বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলাম জনি বাড়িতে নেই। রাস্তার পাশের দেয়ালে বসে আছি। হয়তো টিউশনি শেষ করে এই পথ দিয়েই জনি ফিরবে।
.
দূর থেকে জনিকে দেখেই একটা ভালোলাগা কাজ করছিল। কাছাকাছি আসায় হাসিমুখে সাদা গোলাপটি এগিয়ে দিয়ে বলতেছি,
-অভিনন্দন বন্ধু। তুমি শিক্ষক হয়েছো শুনে গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে। এই দেখো তোমার জন্য একটি কলম উপহার এনেছি। তুমি এই কলম দিয়ে......
-থামো। অনেক বলেছো। কাকে বন্ধু বলতেছো? কোন নেশাখোর ছেলে আমার বন্ধু হতে পারেনা।
লজ্জানত হয়ে আবারো বলতেছি,
-জনি আসলে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সেদিন সিগারেটে দুইটা টান....
- আর কিছু শুনতে চাচ্ছিনা আমি। আশা করব আমার সামনে এসে আর কখনো বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে দাড়াবেনা।
কথাগুলো বলে জনি হনহন করে চলে যাচ্ছে। আমার চোখে কি যেন পড়ছে। চোখ কচলাতে ইচ্ছে করছে। নিশ্চয় চোখে কিছু পড়ছে। তাই গাল বেঁয়ে পানি পড়ছে টপটপ করে।
.
জনির সাথে আমার আর কোনদিন কথা হয়নি। কয়েকদিন হঠাৎ রাস্তায় দেখা হত। সে ফিরেও তাকাতনা। আমিও নিজেকে অনেক শক্ত করে ফেলেছি। এখন আর আবেগের বশে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েনা।
.
তিন বন্ধু মিলে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছি। বাড়ির কাছের চার রাস্তার মোড়ে মানুষের জটলা দেখে এগিয়ে গেলাম। সেখানে একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে কয়কজন গাছের ডাল দিয়ে পিটাচ্ছে। ছেলেটি আর মেয়েটি তবুও কান্না করেনা। শুধু হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করতেছে। উপস্থিত একজনের কাছে জানতে চাইলাম, "ভাই কী হয়েছে?"
লোকটি জবাব দিল, "পুকুর পাড়ে তাল গাছের নিচে ছেলেটি আর মেয়েটি আপত্তিকর অনৈতিক কাজ করার সময় ধরা পড়ে। এলাকার ছেলেপুলে রাস্তা থেকে দেখতে পেয়ে ওদের ধরে নিয়ে এসে পিটাচ্ছে। ছেলে মেয়ে দু'জনই অপরাধ স্বীকার করেছে। মনে হয় একটু মারধর করে ছেড়ে দেবে।"
আরেকটু কাছে গেলাম। মেয়েটিকে আগে কখনো এই এলাকায় দেখেছি বলে মনে হচ্ছেনা। ছেলেটির দিকে তাকাতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম। ছেলেটি আর কেউ নয়, জনি।
.
কেন যেন খুব খারাপ লাগতেছে মনে। বাড়ি ফিরতেছি আর ভাবতেছি, জনিতো শিক্ষক হয়েছে। সে তো স্কুলের ছোট ছেলে মেয়েদের জ্ঞান দিবে। কিন্তু যে জ্ঞান দিবে, সে জ্ঞানীতো?
পাশ থেকে রফিক বলতেছে, "কিরে? ছেলেটিকে তোর বন্ধু জনির মত দেখলাম।"
আমি জবাব দিলাম, "ধুর, কোন চরিত্রহীন ছেলে আমার বন্ধু হতে পারেনা।"

No comments:

Post a Comment