Monday, September 10, 2018

একটি বোবা মেয়ের গল্প




রাস্তায় কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো।ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠতেই পিছন থেকে সিন্থিয়া হাতটা টেনে ধরলো!
:কি হলো ঘুম আসছেনা??
আমার হাতটাকে বুকের সাথে আরো শক্ত করে চেপে ধরে শুয়ে রইলো।
:ওয়াশরুমে যেতে হবে যে!
হাতটা ছেড়ে দিলো।ইশারায় বুঝিয়ে দিলো,যে যেনো তারাতারি ফিরে আসি।
ওয়াশরুমের কাজ সেরে এসে আবার তার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললাম,
:এই যে আমি এসে গেছি!
সে আমার দিকে ফিরে আমাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরলো।
আর আমি সেই এক অদ্ভুত অনুভূতির মাঝে সাঁতরে তার স্বাদ নিচ্ছি,এবং পুরোনো সৃতিগুলো ভেবে মনে মনে হাসছি।
নতুন বাসায় উঠেছি আজ।
জিনিসপত্র সব গুছিয়ে একটু ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় ছাদে উঠলাম ছোট ৬ বছরের বোনকে নিয়ে।ছাদে উঠেতো আমি আর আসফিয়া(আমার ছোট বোন) পুরোই অবাক।অসম্ভব সুন্দর একটা ছোট্ট কাঁচের ঘর,উপর দিয়ে পুরো ফাঁকাযার ভিতর কেউ বসে আছে।আমি আসফিয়াকে নিয়ে এককোনে যাবো ভাবলাম।কিন্তু তার আগেই সে গায়েব!!চেয়ে দেখি সে কাঁচের ঘরের ভিতর ঢুকে সেখানে থাকা মেয়েটার সাথে কথা বলছে।আমি দাড়িয়ে রইলাম তার ফিরে আসার জন্য।কিছুক্ষন পর মুখ গোমড়া করে ফিরে আসে।
:আমার আপুটা কি হয়েছে?
:ভাইয়া মেয়েটাতো আমার সাথে কথাই বলল না।শুধু আমার দিকে চেয়ে রইলো।মনে হয় বোবা!
:ছি!না জেনে কারো নামে এসব বলতে নেই।
:আরে না সত্যি বলছি!!
সেদিন আর ছাদে থাকিনি।চলে এসেছিলাম নিজের রুমে।তবে সন্দেহ হলো ঐ ঘরটাকে ওইখানে বানানোর আর তার মধ্যে মেয়েটার থাকার জন্য। পরদিন অফিস থেকে ফিরে রাতে ৮ টার দিকে ছাদে গিয়ে দেখলাম মেয়েটা আজও সেখানে বসা।আমি দরজায় নক করলাম,সে বাহিরে বের হয়ে এসে আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেআমি বললাম,
:আসলে আপনাকে একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিলো।
ইশারায় বলতে বললে বললাম,
:আসলে আমার বোন বলেছিলো আপনি নাকি বোবা।
:সে কিছু না বলে অন্য দিকে চেয়ে রইলো।
'
:সরি!!! আমার আসলে একটু সন্দেহ ছিলো।আসলে কার কপালে কি লেখা থাকে তা কিন্তু সবাই জানেনা।
কথাটি শেষ করার আগেত্য"ই সে ঘরে ত। ঢুকে গেলো।আমিও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কিছুক্ষন থেকে রুমে চলে আসলাম।পরের দিন অফিস ছুটি ছিলো, তাই আমি আর আমার সাথে আসফিয়া দুজন বিকালে ছাদে বসে ছিলাম। পরে আসফিয়া হঠাৎ বলল,
:ভাইয়া একটা গান গাওনা!
:না এখন না।
:আরে ভাইয়া গাওনা!!
:আচ্ছা দাড়া গাচ্ছি।
তখন দেখলাম দুটো ছেলে আসলো।দেখে মনে হচ্ছে দুই জমজ ভাই।বয়স আনুমানিক আসফিয়ার চেয়ে একটু বড়!
:আমরাও শুনবো আপনার গান!
:আচ্ছা!তা তোমাদের নাম?
:আমি সাফি আর ও রাফি।৩ তলায় থাকি।আপনারা মনে হয় নতুন এসেছেন।
:হ্যা এইতো দুই তিন দিন হলো।
:দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি বোবা মেয়েটি দাড়িয়ে আছে।আমি তাকাতেই চলে গেলো।
ভাবছিলাম কোন গানটা গাইতে পারি।আসলে কেউ গান গাইতে বললে গাইতে চাইনা।কিন্তু যখন গান গাইতে চাই তখন গান খুজে পাইনা।
:কি গাইতে পারি,,,,,,,,,,,,,,,,,,
:ভাইয়া একটা হিন্দি গান গাও
:না বাংলা,
:আরে বললাম তো হিন্দি।
ওরা কি গান গাবো তা নিয়ে তর্কাতর্কি করা শুরু করে দিলো।তখন সাফি বলে উঠলো,
:ভাইয়া তাহসানের ভালোবাসি গানটা গাওনা!
:আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে।
ঠিক তখনই দেখলাম যে সেই বোবা মেয়েটা একটা গিটার নিয়ে আসলো।আর আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।আমি তখন তাকে বললাম,
:জ্বি আমিতো আসলে গিটার বাজাতে পারিনা।
সে আমাকে ইশারায় বলল সমস্যা নেই আমি পারি বাজাতে।
তারপর পাশে রাখা আমার ফোন নিয়ে তার ফোনে একটা কল দিয়ে কেটে দিলো।তারপর আমাকে ফোনটা দিয়ে একটা মেসেজ পাঠালো।যাতে লেখা ছিলো,
:কোন গানটা গাবেন??
আমিও রিপ্লে দিলাম,
:তাহসানের ভালোবাসি।
সে গিটার বাজানো শুরু করলো।আমি ছাদে রাখা একটু উচু কিছু একটার উপর বসলাম।তারপর গাওয়া শুরু করলাম,
"আমার এই আধার আমার কবিতা,
সময়ের পাতায় যা লিখে চলি,,,
ছিলো সবই তোমারও আছে আজও তোমার,,,,
আধারের নির্ঝরতা,,,,,
এই নিঝুম রাতে একা আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে,,
চিৎকার করে বলতে চাই তোমায় আমি,,,,,,
গানটা গাচ্ছিলাম আর মেয়েটার দিকে মাঝে মাঝে কেনো জানি চোখ চলে যাচ্ছিলো।আর যখনই গাইলাম,,,,,
ভালোবাসি, ,,,,, শুধু তোমায় ভালোবাসি,,,
এখনো শুধু তোমায় ভালোবাসি,,,
তখনও তার দিকেই চেয়েছিলাম,কেনো জানিনা। তবে ইচ্ছা করে তাকাইনি।আমাদের চোখাচোখি হলে সাথে সাথে সে নিচের দিকে তাকায়।মনে হয় লজ্জা পেয়েছে।
তারপর হঠাৎ একটা ফোন আসলো,দেখি নাইম ফোন দিয়েছে।
:হ্যালো!
:কি হইছে??
:আরে সাদ এর এক্সিডেন্ট হইসে একটা সি এন জির সাথে।এক্ষন ঢাকা মেডিকেল আয়।
আমি দ্রুত সেখান থেকে উঠে যাওয়ার সময় আসফিয়াকে সন্ধ্যা হলে বাসায় চলে যেতে বলি।
মেডিকেল থেকে ফিরতে রাত প্রায় ৯ টা বাজে।বাসায় ঢুকতেই আম্মু জিজ্ঞাসা করলো
:কিরে কোথায় গেলি??
:একটু কাজ ছিলো বাইরে।
:তা আসফিয়া কোথায়?ও তো তোর সাথেই ছিলো!
আমি আর কিছু বললাম না।সোজা ছাঁদ।
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেই আসফিয়াকে বললাম,থাপ্পড় দিয়ে কান লাল করে দিবো।বলে তাকে কোলে করে তাকে ঘরে নিয়ে কতক্ষন বকলাম।হঠাৎ একটা unknown নাম্বার থেকে কল আসলো।
:হ্যালো!
:,,,,,,,,,,,,,, , ,,,,,,,,
***রাত ৯:১৩
চারিদিকে নিরবতা বিরাজমান।
আমি মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে।আর পাশে থাকা মানুষটি কিছু টাইপ করছে,,,,
টুং!!!!
মেসেজে লেখা,,,
"আসলে আমিই আসফিয়াকে আমার সাথে রেখে দিয়েছিলাম।ওর কোনো দোশ নেই।আপনি ওকে ওভাবে না বকলেও পারতেন"
,
,
,
:কি হলো??কিছু বলছেন না যে!
:কি বলবো?বলার কিছুই নেই!!
কিছুক্ষন নিরবতা,,,,,
:আচ্ছা আপনি কিন্তু খুব ভালো গিটার বাজাতে পারেন।
:জ্বি আসলে ছোট বেলায় শিখেছিলাম।
:ও আচ্ছা।
:আপনিও
:কি?
:খুব ভালো গান গাইতে পারেন।
:আরে নাহ!ততো ভালোনা!
:সত্যি বলছি।
:হুমমম।
আচ্ছা আপনি কি সারাদিনই ছাদে থাকেন নাকি?
:জ্বিনা আসলে যখন মন বলে তখন।
:তাই?তারমানে আপনি মনের কথাকে প্রাধান্য বেশি দেন?
:জ্বি
:ও আচ্ছা।জ্বি আমি তাহলে আসি।
:থাকুন না কিছুক্ষন!আপনার সাথে কথা বলে ভালোলাগছে।
:ভালোযে আমারো লাগছে,,,নাহ আর ভালো লাগাতে হবেনা।আমি আসি,
:আচ্ছা।
ঘরে এসে রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেলাম।তবে ঘুম আসলো রাতের একেবারে শেষের দিকে।আসলে,,
হ্যা আপনারা যা ভাবছেন তাই,,,আমি মেয়েটার কথাই ভাবছিলাম।
ভাবছি মেয়েটার সাথে আর দেখা করবোনা।কারন ওই চেহারার সামনে একবার গেলে মনে হয় দুটো চোখ আমাকে বন্দি করে রেখেছে।
এতো ভাবি!কিন্তু যখনি ফোনে একটা মেসেজ আসে "একটু ছাঁদে আসবেন??
তখন আর বসে থাকতে পারিনা।
:আজ ডাকলাম আসলেন না কেনো?
:আসলে আম্মুর এক বান্ধবির মেয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।আম্মু চান আমার সাথে ওই মেয়েটার বিয়ে দিতে।
৩০ মিনিট পর তার ফোন এলো।
: আপনি কি সত্যি বিয়ে করবেন??
আমি "থ"
ফোনটা কেটে গেলো।
আমি একদৌড়ে ছাঁদে।কিন্তু সেখানে কাউকেই পেলাম না।আর তাকে জিজ্ঞাসাও করা হয়নি যে সে কোন ফ্লাটে থাকে।
আমার মাথায় তখন একটা জিনিসই ঘুরছিলো।এ আমি কি শুনলাম!!!
সে কথা বলতে পারে??আমিতো তার নামটাও জানিনা!!রুমে আসতেই আসফিয়া বলল বাড়িওয়ালা আঙ্কেল এসেছিলো।আম্মু আব্বুর সাথে অনেক্ষন কথা বলল তারপর চলে গেলো।আর আমাকে বলে গিয়েছে যে আমি যেনো তোমাকে তার বাসায় যেতে বলি।
আমি আঙ্কেলের সমনে বসা।তারচোখ দিয়ে পানি পড়ছে।কিছুক্ষন পর সে বলা শুরু করলো।
"সিন্থিয়া তখন ক্লাস ৫ এ পড়তো।আমার ব্যাবসাটা খুব একটা ভালো চলছিলো না।আমি তখন প্রায়ই মদ খেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরাতাম আর ওর মাকে কারনে অকারনে খুব মারতাম।একদিন ওর মার খুব জ্বর হয়। কিন্তু আমি ওর মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাইনি।আমি তখন মাতাল ছিলাম।সিন্থিয়া ওর চাচার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলো।যেদিন ও আসলো সেদিন,
দরজা খোলা ছিলো।আমি ওর মাকে ডাকছিলাম!
এই ওঠো,আমি আর তোমাকে মারবোনা।এই ওঠো!!
আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে আমি মস্ত বড় একটা ভুল করে ফেলেছি।কিন্তু তখন খুব দেড়ি হয়ে গিয়েছিলো।সবাই জেনেছিলো ওর মা হার্ট এটাক করেছলো।সব কিছু আমার ভাই সামলে ছিলো।কিন্তু সিন্থিয়া কোনো অভিযোগ করেনি।সে নিরব হয়ে গিয়েছিলো।যেদিন তার মাকে কবর দিয়েছিলাম,সেদিন সে অনেক কেঁদেছিল।কিন্তু তারপর সে আর কোনো দিনই কাদেনি।আমি অনেক চেষ্টা করেছি তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার।কিন্তু সে আমার সাথে গত ১০ বছরে একটা কথাও বলেনি।আজ কিছুক্ষন আগে সিন্থিয়া আমার রুমে এসে কাঁদছিলো।আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনাই।আমিও তা দেখে কেঁদে দিলাম।সে দৌড়ে এসে আমাকে জরিয়ে ধরে বলে
:আমি প্রলয়কে চাই।
:আমি বললাম মা কি হয়েছে আমাকে বল।
:আমি প্রলয়কে চাই।
আমার মেয়ে আজ ১০ বছর পর আমার সাথে কথা বলে কিছু চেয়েছে।আমি তাকে ওয়াদা করেছি যে তোমাকে তার কাছে ফিরিয়ে দিবো।তুমি আমাকে নিরাশ করোনা তুমি যা বলবে আমি তাই করতে রাজি আছি,আমি তোমার বাবা মার সাথে কথা বলেছি।প্লিজ আমার মেয়েকে বিয়ে করো।
কিছুক্ষন নিরবতা,,,,,,,,,
:সে কোথায়??
আমাকে সিন্থিয়ার রুম দেখিয়ে দিলেন।আমি রুমে ঢুকতেই দেখলাম সে আয়ানার সামনে দাড়িয়ে সাজছে।
:এইযে!!
সে ঘুরে আমার দিকে তাকালো।
তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি যেনো কোনো সুগভীর সাগরের মাঝে ডুবে যাছিলাম।আর তার সৌন্দর্যের কথা লেখার দ্বারা বর্ননা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি তার কাছে গিয়ে তাকে আবারও বললাম,,
:মনে যায়গা খুজছি।আপনার মনে যায়গা হবে???
সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
:কি হলো যায়গা নেই?যাক সমস্যা নেই অন্য কারো কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি।
বলেই যেই ঘুরে দরজার কাছে যেতে চাইলাম তখনই আমার হাত ধরে তার দিকে ফিরিয়ে শক্ত করে জরিয়ে ধরে কেঁদে দিলো,খুব শক্ত করে,যেনো আমি হারিয়ে যাচ্ছি।আমি বললাম,
:এইযে!!! এতো শক্তি কোথায় পেলে এতোটুকু শরীরে?
সে আমার গলায় একটা চুমু দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
:ভালোবাসি,,আর আমায় ভালোবাসবে?
:না।
:বাসতে হবে!না হলে খুন করে ফেলবো।

No comments:

Post a Comment